বারাসতের রাস্তায় দিনের আলোয় সবকিছুই স্বাভাবিক। দোকানপাট, মানুষের ভিড়, ব্যস্ততা—সবই যেন এক সাধারণ শহরের ছবি। কিন্তু রাত নামলেই শহরটা যেন অন্য রূপ নেয়। আলো-ঝলমলে স্পা সেন্টারের কাঁচের দরজার আড়ালে চলছিল এমন এক ব্যবসা, যার গন্ধে শিউরে উঠছে গোটা জেলা।
এই গল্প শুরু হয়েছিল একটি নাবালিকা অপহরণের অভিযোগ থেকে। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে এক ভয়ংকর চক্রের অস্তিত্ব—যেখানে স্পা মানে ছিল না আরাম, বরং দেহব্যবসার অন্ধকার কারখানা।
অপহরণের তদন্তে পুলিশের সামনে খুলে গেল ভয়ংকর নেটওয়ার্ক
বারাসত কাজিপাড়া লাগোয়া একটি স্পা সেন্টারকে কেন্দ্র করে সন্দেহ তৈরি হয়। পুলিশ যখন অপহৃত নাবালিকার খোঁজে সেখানে পৌঁছায়, তখনই প্রথম ধাক্কা।
ম্যানেজার, দালাল—মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে আরও বড় তথ্য—এই চক্রে জড়িত রয়েছে আরও সাত-আটজন, যারা এখনো ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পুলিশের এক অফিসার বলেন, “এটা শুধু একটি স্পা নয়, পুরো একটি নেটওয়ার্ক। বহুদিন ধরে চলছিল।”
নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের টার্গেট—মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা
দালালরা খুব হিসেব করে টার্গেট বেছে নিত। নিম্নবিত্ত পরিবারের নাবালিকা ও তরুণীরা—যাদের স্বপ্ন দেখানো সহজ, আর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কম।
তাদের বলা হত— “একটু কাজ করলেই হাজার টাকা। কেউ জানবে না।”
এই লোভে অনেকেই ফাঁদে পা দিত। তারপর শুরু হত ভয়ংকর যাত্রা—স্পা সেন্টারের অন্ধকার ঘরে আটকে থাকা, ভয় দেখানো, এবং দেহব্যবসায় নামিয়ে দেওয়া।
মধ্যমগ্রাম থেকে অশোকনগর—পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল নেটওয়ার্ক
তদন্তে উঠে এসেছে, শুধু বারাসত নয়—মধ্যমগ্রাম, অশোকনগর, দেগঙ্গা, এমনকি হাবড়া পর্যন্ত এই নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে ছিল। কিছু নাবালিকা এখনও এই চক্রের মধ্যে আটকে আছে বলে সন্দেহ।
পুলিশ এখন তাদের উদ্ধার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এমন ঘটনা নতুন নয়—বাংলার বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের চক্র ধরা পড়েছে
এই ঘটনা আলাদা নয়। গত কয়েক বছরে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের সিন্ডিকেট ধরা পড়েছে—
১) সোদপুর স্পা কাণ্ড
একটি স্পা সেন্টারের আড়ালে চলছিল দেহব্যবসা। সেখানে উদ্ধার হয়েছিল তিনজন নাবালিকা।
২) নিউটাউন ‘ওয়েলনেস সেন্টার’ র্যাকেট
বিলাসবহুল সেন্টারের আড়ালে চলছিল VIP ক্লায়েন্টদের জন্য বিশেষ সার্ভিস। ম্যানেজার ও মালিক—দুজনই গ্রেপ্তার।
৩) শিলিগুড়ির ‘ম্যাসাজ থেরাপি’ চক্র
নেপাল ও বিহার থেকে মেয়েদের এনে কাজে লাগানো হত। পুলিশ উদ্ধার করেছিল ১১ জন তরুণী।
এই ঘটনাগুলো দেখায়—স্পা ও পার্লারের আড়ালে দেহব্যবসার সিন্ডিকেট এখন একটি সাংগঠনিক অপরাধ শিল্পে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ সুপারের কড়া বার্তা—“একটাও স্পা বাদ যাবে না”
বারাসত জেলা পুলিশ সুপার প্রতীক্ষা ঝাড়খরিয়া জানিয়েছেন
“নাবালিকাদের উদ্ধারই আমাদের প্রথম কাজ। পলাতক মালিক ও দালালদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। সব স্পা সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করা হবে।”
এখন জেলার প্রতিটি স্পা ও পার্লার আতসকাচের নিচে। যেখানে আগে ছিল সুগন্ধি, আলো, আর মিউজিক—সেখানে এখন পুলিশের টর্চলাইট।
স্থানীয়দের আতঙ্ক—কিন্তু আশার আলোও আছে
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন— “আমরা ভাবতেই পারিনি এমন কিছু আমাদের পাশেই চলছিল।”
তবে পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে মানুষ আশ্বস্ত। নাবালিকাদের উদ্ধার এবং দালালদের গ্রেপ্তার—এই দুই পদক্ষেপই দেখাচ্ছে, অন্ধকার সাম্রাজ্য ভাঙার লড়াই শুরু হয়েছে।
শেষ কথা—এই লড়াই শুধু পুলিশের নয়, সমাজেরও
এই ধরনের সিন্ডিকেট শুধু আইন ভাঙে না—একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়। তাই এই লড়াই শুধু পুলিশের নয়, সমাজেরও। প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে—কারণ অপরাধীরা সুযোগ খোঁজে অন্ধকারে, আর অন্ধকার তৈরি হয় আমাদের নীরবতায়।
নাবালিকা অপহরণের তদন্তে নেমে স্পা’য়ের আড়ালে চলা দেহব্যবসার পর্দা ফাঁস করল পুলিশ।
গ্রেপ্তার করা হয়েছে বারাসত কাজিপাড়া লাগোয়া স্পায়ের ম্যানেজার, চক্রের দালাল মিলিয়ে মোট পাঁচজনকে। তদন্তে উঠে এসেছে, এর সঙ্গে জড়িয়ে আরও সাত-আটজন। তাঁদের খোঁজেই চলছে তল্লাশি।
এই ঘটনার জেরে বারাসত ও সংলগ্ন এলাকার একাধিক স্পা ও পার্লার আতসকাচের নিচে।
Discover more from Health Bangla
Subscribe to get the latest posts sent to your email.












Very well presented. Every quote was awesome and thanks for sharing the content. Keep sharing and keep motivating others.