tonsil test

টনসিল ইনফেকশন ও বড় এডিনয়েড: লক্ষণ, কারণ ও সঠিক চিকিৎসা

ঠান্ডা বা গরমের দিনে হঠাৎ গলায় ব্যথা, কোনো কিছু গিলতে গেলেই মনে হয় গলার ভেতর কিছু একটা আটকে আছে—এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি, এমন মানুষ কমই আছেন। আমরা অনেকেই একে সাধারণ গলাব্যথা মনে করে এড়িয়ে যাই। কিন্তু এই সমস্যার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে টনসিল ইনফেকশন কিংবা নাকের পেছনের এডিনয়েড বড় হয়ে যাওয়ার মতো রোগ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই দুটি সমস্যা প্রায়ই কাল হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক সময়ে এর যত্ন না নিলে বা চিকিৎসা না করালে এটি পরবর্তীতে বড় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে।

আজ আমরা খুব সহজ ভাষায় জানবো টনসিল ও এডিনয়েডের সমস্যা কেন হয়, এর লক্ষণগুলো কী কী এবং কখন ডাক্তারের ছুরিকাঁচির নিচে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

টনসিল ও এডিনয়েড আসলে কী?

tonsil adenoid
tonsil adenoid

আমাদের মুখের ভেতরের শেষ প্রান্তে, গলার দুপাশে আঙুরের মতো গোল গোল যে দুটি মাংসপিণ্ড দেখা যায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সেগুলোই হলো পেলাটাইন টনসিল। আর নাকের পেছনের দিকে, যেখানে নাক ও গলা এসে মিশেছে, সেখানে থাকে আরেকটি লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফয়েড টিস্যু, যার নাম এডিনয়েড

সহজ কথায়, এরা আমাদের শরীরের গেটম্যান বা প্রহরী। নাক ও মুখ দিয়ে যখনই কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢোকার চেষ্টা করে, এই গ্রন্থিগুলো তাদের আটকে দেয় এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। কিন্তু যখন এই রক্ষকরা নিজেই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখনই বাঁধে বিপত্তি।

টনসিল ইনফেকশন: কেন হয় এবং কাদের বেশি হয়?

টনসিলে কোনো কারণে জীবাণুর সংক্রমণ হয়ে যখন প্রদাহ বা ইনফেকশন তৈরি হয়, তখন তাকে আমরা ‘টনসিলাইটিস‘ বলি। এই সমস্যাটি বছরের যেকোনো সময় হতে পারে, তবে শীতকালে বা আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় এর প্রকোপ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।

কাদের এই সমস্যা বেশি হয়?

  • সাধারণত ৩ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের মধ্যে টনসিল ইনফেকশন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
  • তবে বড়রা যে একদম নিরাপদ, তা কিন্তু নয়। যেকোনো বয়সের মানুষেরই এই সমস্যা হতে পারে।

মূল কারণগুলো কী কী?

  • ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস এবং ‘বিটা হেমোলাইটিক স্ট্রেপ্টোকক্কাস’ নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই ইনফেকশন হয়।
  • লাইফস্টাইল ও পরিবেশ: ঘন ঘন ঠান্ডা লাগা, অপুষ্টি, অতিরিক্ত ধুলাবালি বা পরিবেশ দূষণ।
  • খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রিম বা ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খাওয়ার অভ্যাস।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: শরীরের স্বাভাবিক ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।

লক্ষণ দেখে কীভাবে বুঝবেন টনসিল ইনফেকশন হয়েছে?

হঠাৎ করে টনসিলের এই তীব্র আক্রমণকে চিকিৎসকরা ‘একিউট টনসিলাইটিস’ বলেন। আপনার বা আপনার সন্তানের এই সমস্যা হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেবে:

  • তীব্র গলাব্যথা: গলার ভেতর প্রচণ্ড ব্যথা হবে এবং যেকোনো শক্ত বা তরল খাবার গিলতে কষ্ট হবে।
  • উচ্চ জ্বর: শরীর ম্যাজম্যাজ করার পাশাপাশি ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তীব্র জ্বর আসতে পারে।
  • মাথাব্যথা ও বমি ভাব: জ্বরের সাথে তীব্র মাথাব্যথা এবং অনেকের বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
  • কান ও শরীরে ব্যথা: গলার সাথে কানের ভেতরের সংযোগ থাকায় ইনফেকশনের কারণে কানেও প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে।
  • শিশুদের লালা পড়া: ছোট বাচ্চারা গলাব্যথার কারণে থুতু গিলতে পারে না, ফলে মুখ দিয়ে অনবরত লালা পড়তে থাকে।

ওষুধ নাকি ঘরোয়া টোটকা: টনসিল ইনফেকশনের চিকিৎসা

প্রথমবার টনসিলের ইনফেকশন হলে শুরুতেই ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এবং কিছু নিয়ম মেনে চললে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা:

সাধারণত ডাক্তাররা লক্ষণ দেখে এন্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক ওষুধ, মাউথওয়াশ এবং এন্টিহিস্টামিন দিয়ে থাকেন। মনে রাখবেন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মনগড়া এন্টিবায়োটিক খাওয়া শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ঘরোয়া কিছু জাদুকরী উপায়:

ওষুধের পাশাপাশি এই ছোট্ট অভ্যাসগুলো আপনাকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করবে:

  • দিনে ৩-৪ বার হালকা কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গড়গড়া (Gargle) করুন।
  • লবঙ্গ, আদা বা লেবু দিয়ে গরম চা পানের অভ্যাস করুন।
  • সারাদিনে প্রচুর পরিমাণে হালকা গরম পানি পান করুন।
  • পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ফ্রিজের ঠান্ডা খাবার ও আইসক্রিম একদম ছোঁবেন না।

অবহেলা করলে ক্রণিক টনসিলাইটিস ও মারাত্মক ঝুঁকি!

অনেকেই আছেন যারা গলাব্যথা হলে ফার্মেসি থেকে দু-একটা ওষুধ কিনে খেয়ে সাময়িক আরাম পান, কিন্তু পুরো কোর্স শেষ করেন না। এই অবহেলার কারণে ইনফেকশনটি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়, যাকে বলা হয় ‘ক্রণিক টনসিলাইটিস‘। যদি কোনো ব্যক্তির বছরে ৪-৫ বার করে টানা দুই বছর এই ইনফেকশন হয়, তবে বুঝে নিতে হবে টনসিল দুটি স্থায়ীভাবে কার্যক্ষমতা হারিয়েছে।

অসুস্থ টনসিল সময়মতো অপারেশন না করালে শরীরে কী কী বড় ক্ষতি হতে পারে, তা দেখে নেওয়া যাক:

সম্ভাব্য জটিলতাশরীরে এর ক্ষতিকর প্রভাব
পেরিটনসিলার এবসেসটনসিলের চারপাশে ইনফেকশন ছড়িয়ে পুঁজ বা ফোড়া তৈরি হয়, যা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।
শ্বাসকষ্টটনসিল অতিরিক্ত বড় হয়ে গলার ভেতরের বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয় এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
বাতজ্বর বা রিউমাটিক ফিভারব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন থেকে শিশুদের বাতজ্বর হতে পারে, যা পরবর্তীকালে হার্টের ক্ষতি করে।
কিডনির ক্ষতিটনসিলের জীবাণু রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস নামক জটিল রোগ তৈরি করতে পারে।
ক্যান্সারের ঝুঁকিবয়স্কদের ক্ষেত্রে যদি হঠাৎ একদিকের টনসিল অস্বাভাবিক বড় হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন প্রদাহ থাকে, তবে সেটি ক্যান্সারের লক্ষণও হতে পারে।

একটি জরুরি তথ্য: অনেকেই মনে করেন টনসিল কেটে ফেললে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমাদের মাথা ও গলার চারপাশে প্রায় ৩০০টির মতো লসিকাগ্রন্থি আছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া দুটি টনসিল কেটে ফেললে বাকি গ্রন্থিগুলো সহজেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে পারে।

শিশুদের নীরব শত্রু: বড় এডিনয়েড

adenoid when need operation
adenoid when need operation

এবার আসি শিশুদের আরেকটি পরিচিত কিন্তু আড়ালে থাকা সমস্যা নিয়ে—তা হলো এডিনয়েড বড় হয়ে যাওয়া। জন্ম থেকেই সব বাচ্চার এই এডিনয়েড গ্রন্থিটি থাকে। সাধারণত ৩ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত এটি আকারে কিছুটা বাড়ে এবং এরপর আস্তে আস্তে ছোট হতে থাকে। ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সে এটি সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়।

কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন কোনো বাচ্চার এই গ্রন্থিটি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বড় হয়ে নাকের পেছনের বাতাস চলাচলের রাস্তাটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

বড় এডিনয়েডের লক্ষণগুলো কী কী?

বেশিরভাগ বাবা-মা এই লক্ষণগুলোকে সাধারণ ঠান্ডা মনে করে ভুল করেন। আপনার শিশুর মধ্যে এই বিষয়গুলো খেয়াল করুন:

  • মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া: নাক বন্ধ থাকার কারণে শিশু সারাক্ষণ মুখ হাঁ করে থাকে এবং মুখ দিয়েই শ্বাস নেয়।
  • ঘুমে নাক ডাকা: রাতে ঘুমানোর সময় শিশু বড়দের মতো জোরে জোরে নাক ডাকে।
  • কান বন্ধ থাকা ও সর্দি: সারা বছরই নাক দিয়ে সর্দি ঝরে এবং ঘন ঘন কানের ইনফেকশন হয় বা কান বন্ধ থাকে।
  • মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া: রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারার কারণে শিশুর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যায় এবং স্বাভাবিক বুদ্ধি বা শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

কখন অপারেশন করা জরুরি এবং কতটা নিরাপদ?

প্রাথমিক অবস্থায় টনসিল বা এডিনয়েডের সমস্যা হলে চিকিৎসকরা এক্স-রে বা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধের মাধ্যমেই তা নিরাময়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা যদি অ্যাডভান্সড বা জটিল পর্যায়ে চলে যায়, তখন অপারেশনই একমাত্র নিরাপদ সমাধান।

কখন অপারেশন করাবেন?

  • যদি ঘুমের মধ্যে শিশুর শ্বাস সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় (স্লিপ অ্যাপনিয়া) এবং সে ধড়ফড় করে জেগে ওঠে।
  • বাচ্চার নাক ডাকার সমস্যা যদি তীব্র আকার ধারণ করে।
  • বছরে বারবার টনসিলের ইনফেকশনে ভুগে বাচ্চার পড়ালেখা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে।
  • যদি ওষুধে আর কোনো কাজ না হয়।

বর্তমানে আমাদের দেশে অত্যন্ত আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতিতে টনসিল (টনসিলেকটমি) এবং এডিনয়েড (এডেনয়েডেকটমি) অপারেশন করা হচ্ছে। অপারেশনের পর প্রথম কয়েকদিন একটু গলাব্যথা ছাড়া আর কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি থাকে না।

শেষ কথা

টনসিল ইনফেকশন বা বড় এডিনয়েড কোনো অবহেলার বিষয় নয়। সামান্য সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত আপনার সন্তানকে বড় কোনো শারীরিক জটিলতা থেকে রক্ষা করতে পারে। আপনার শিশুর মধ্যে মুখ হাঁ করে ঘুমানো, নাক ডাকা বা ঘন ঘন গলাব্যথার মতো লক্ষণ দেখলে আজই একজন অভিজ্ঞ নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের (ENT Specialist) পরামর্শ নিন।

আপনার কি এই বিষয়ে কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা প্রশ্ন আছে? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *