হেপাটাইটিস থেকে বাঁচুন

যকৃত তথা লিভার মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। মানুষের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় লিভার অত:প্রত ভাবে জড়িত। আমরা প্রতিদিন যা খাই তা হজম হয়ে রক্তে প্রবেশের আগে লিভারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সে হিসেবে লিভারের কাজ অনেকটা পোর্টের মত। যা কিছু শরীরে প্রবেশ করছে তার ভাল মন্দ বাছাই করে ভালটা রাখা এবং মন্দটাকে অপসারণ করার কাজটি সমপাদন করে লিভার। এছাড়াও, লিভার রক্তে বিভিন্ন ধরণের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন সিনথেসিস তথা সংশ্লেষ করে। উক্ত প্রোটিনগুলোর মাধ্যমে রক্তে বিভিন্ন পদার্থ পরিবহন, রক্ত জমাট বাঁধা, রক্তের তারল্য বজায় রাখার দায়িত্ব লিভার বহন করে। ভিটামিন এ, ই ও বি-১২ এর মত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন সঞ্চয়ের কাজ করে লিভার। লিভার বিভিন্ন ওষুধকে ব্যবহার উপোযোগী করে ও বিষাক্ত পদার্থকে বিষমুক্ত করে শরীর থেকে বের করে দেয়। ফলে, লিভার রোগে আক্রান্ত হলে তা পুরো মানবশরীরে অত্যন্ত বিরুপ প্রভাব ফেলে।

Hepatitis

কতগুলো ভাইরাস লিভারে স্বল্পমেয়াদী এবং কতগুলো ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই ভাইরাসগুলোকে বলা হয় হেপাটাইটিস ভাইরাস এবং সৃষ্ট রোগকে বলে হেপাটাইটিস। মানব লিভার প্রধানত পাঁচটি ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হয়। ইংরেজী বর্ণমালার প্রথম পাঁচটি অক্ষর দিয়ে এদের নাম রাখা হয়েছে যথাক্রমে হেপাটাইটিস এ,বি,সি,ডি এবং ই। এর মধ্যে হেপাটাইটিস এ ও ই লিভারে স্বল্পমেয়াদী প্রদাহ করে এবং হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ করে।

হেপাটাইটিস থেকে বাঁচুন – Hepatitis Cure

বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষ হেপাটাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। হেপাটাইটিস বি দ্ব্বারা প্রতি বছর স্বল্পমেয়াদী প্রদাহে আক্রান্ত হয় প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ এবং প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহে আক্রান্ত থাকে। সে হিসেবে সারা বিশ্বে প্রতি ১২ জনে একজন হেপাটাইটিস বি অথবা সি দ্ব্বারা আক্রান্ত। প্রতি বছর দীর্ঘমেয়াদে হেপাটাইটিস সি দ্ব্বারা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৭ কোটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী মানুষের মৃত্যুর কারণের দিক দিয়ে হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত সিরোসিসের অবস্থান দশম।

 

উক্ত পরিসংখ্যানের আলোকে হেপাটাইটিস রোগের প্রাদূর্ভাব ও ভয়াবহতা বিবেচনা করে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৮ শে জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে তাল মিলিয়ে ২৮ শে জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষ্যে হেপাটাইটিস সমপর্কে জনসচেতনতা তৈরীর লক্ষ্যে প্রতি বছর আমাদের দেশেও হেপাটলজি সোসাইটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন উক্ত দিবসটি পালন করে আসছে।

 

মানব দেহের উপর হেপাটাইটিস রোগের প্রতিক্রিয়া

হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলোকে সংক্রমণের মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে দু’ভাগে ভাগ করা হয়: এক, পানি ও খাদ্যবাহিত ভাইরাস- হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ এবং দুই, রক্ত কিংবা দূষিত সিরিঞ্জ-এর মাধ্যমে বাহিত ভাইরাস- হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ডি’।হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস দ্বয় ছড়ায় দূষিত পানি এবং খাবারের মাধ্যমে। ফলে, রাস্তার ধারের খোলা খাবার, আঁঁখের রস, শরবত ও দূষিত খাবার এ ভাইরাসে আক্রান্ত করার জন্য দায়ী। এছাড়া, যারা শহরে বাস করেন কিন্তু পানি না ফুটিয়ে পান করেন কিংবা যারা গ্রামে গঞ্জে টিউবয়েলের পানির পরিবর্তে ডোবা-নালা-পুকুর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন তারাও হেপাটাইটিস ‘এ’ বা ‘ই’ তে আক্রান্ত হতে পারেন। 

 

ভাইরাসদ্বয় পানি বা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশের ১৫-৬০ দিন পর জণ্ডিস দেখা দেয়। আমরা জানি, ভাইরাস কোষের ভিতর প্রবেশ করে কোষের ভিতরের ডিএনএ ও বিভিন্ন এনজাইম ব্যবহার করে বংশবৃদ্ধি করে। হেপাটাইটিস ভাইরাস লিভারের কোষে আক্রমণ করে। লিভারের কোষ নষ্ট হলে বিলিরুবিন রক্তে প্রবেশ করে। ফলে, রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায় এবং জণ্ডিস দেখা দেয়। এছাড়াও, লিভার আক্রান্ত হওয়ায় ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, বমি, জ্বর, পেটের ডান দিকে পাজরের নিচে ব্যথা নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। তবে, হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস সবাইকে সমান মাত্রায় আক্রান্ত করে না। এ কারণে, রোগের লক্ষণের মাত্রায় ভিন্নতা দেখা যায়। ‘এ’ ভাইরাস সাধারণত শিশুদের বেশী আক্রমণ করে এবং প্রাপ্তবয়স্করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় ‘ই’ ভাইরাসের শিকার। ভাইরাসদ্ব্বয় দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়ায় বিধায় বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় মহামারীর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে বন্যার সময় হেপাটাইটিসের মহামারীর জন্য দায়ী হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাস।  

 

হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’-কে বলা হয় সেল্ফ লিমিটিং ডিজিজ। অর্থাত্, আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এদেরকে শরীর থেকে দূর করার জন্য যথেষ্ট এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জণ্ডিস আপনাআপনি সেরে যায়। সাধারণত হেপাটইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ মারাত্মক কোন সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হেপাটিক ফেইলারের মত ভয়াবহ পরিণতি আনতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের হেপাটিক ফেইলার হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। যদি জণ্ডিসে আক্রান্ত কোন রোগী অস্থিরতা, অস্বাভাবিক আচরণ করে বা অজ্ঞান হয়ে যায়, তখন বুঝে নিতে হবে যে তা জরুরী অবস্থা এবং কোন বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের স্মরণাপন্ন হতে হবে এবং হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।  

 

হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে, বাচ্চার কোমল ত্বকের সংস্পর্শে মা থেকে বাচ্চাতে, লালার মাধ্যমে, একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ যৌনমিলনের মাধ্যমেও ভাইরাস দুটি ছড়ায়। এছাড়াও, আকুপাংচার, মুসলমানী, নাক-কান ফুঁড়ানো, নাপিতের ক্ষুর ইত্যাদি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করার মাধ্যমে এরা ছড়াতে পারে। আক্রান্ত মায়ের শিশু সন্তান, আক্রান্ত পরিবারের অন্যান্য সদস্য, বহুবার রক্তগ্রহনকারী রোগী, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক অবসাদগ্রস্থ ব্যক্তি, স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথা হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ যেমন ডাক্তার, নার্স, ল্যাবরেটরীতে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ, দন্তরোগের চিকিত্সকগণ এই ভাইরাসদ্ব্বয়ে আক্রান্ত হওয়ার জন্য অত্যধিক ঝুকিপূর্ণ।

 

হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের পর এক থেকে ছয় মাস সুপ্তাবস্থায় থাকে। অত:পর, লিভার আক্রমণের বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। সাধারণত ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের মত জণ্ডিস এই ভাইরাস দুটি দিয়ে হয় না। মূলত দুর্বলতা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, ক্ষুধামন্দা, বুকের নিচে পেটের ডানদিকে অস্বস্তি ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়। কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে জণ্ডিস, জ্বর ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। তবে, এই ভাইরাসদ্ব্বয় দীর্ঘদিন যাবত নিরবঘাতকের মত কাজ করে এবং এই সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে স্পষ্ট কোন লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু, এ অবস্থায় অন্যান্য ব্যক্তির মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। 

 

‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস যখন লিভারে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে, তখন মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই ভাইরাসগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তবে এই প্রতিরোধ হেপাটাইটিস ‘এ’ বা ‘ই’ ভাইরাসকে শরীর থেকে দূর করতে পারে কিন্তু হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ (hepatitis c cure) -কে পুরোপুরি দূর করতে পারে না।  দীর্ঘদিন যাবত ‘বি’ অথবা ‘সি’ ভাইরাস ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে যুদ্ধ চলতে থাকে তার ফলে লিভারে ফাইব্রোজেনেসিস এবং নেক্রোসিস নামক বিশেষ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরিণামে তা লিভাব সিরোসিসের দিকে ধাবিত হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে সিরোসিস থেকে হেপাটিক ফেইলিউর ও লিভার ক্যান্সার নামক মারাত্মক দশায় উপনীত হতে পারে।

 

হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে আক্রমণ করে বিধায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোন প্রভাব পড়েনা এবং  উক্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। তবে, রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় লিভার সিরোসিস হয়ে যাওয়ার পর। কাউকে রক্ত দিতে গিয়ে বা অন্য কোন অসুস্থতার কারণে রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে হেপাইটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’-এর উপস্থিতি আবিষ্কার করা হয়। এসকল ক্ষেত্রে ঠিক মত চিকিত্সা গ্রহণ করলে লিভারের দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ থেকে লিভার সিরোসিসে রূপান্তরকে প্রতিহত করা সম্ভব। কিন্তু,বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ তাদের শরীরের এই ভয়ংকর ভাইরাসদ্বয়ের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারছে না এবং সঠিক চিকিত্সা গ্রহন করতে পারছে না।

 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় হেপাটাইটিসের প্রভাব

হেপাইটাইটিস ভাইরাস জনিত লিভার রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিকার করা কতটা জরুরী তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এছাড়া লিভার সেন্টারের অভিজ্ঞতায় এটাও প্রতীয়মান হয়েছে যে লিভার রোগীদের একটি বড় অংশ তখনই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে আসেন যখন তাদের রোগ অনেকদূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছে। এর আগে তারা বিভিন্ন কবিরাজ,বৈদ্য,গ্রাম্যডাক্তারের সরণাপন্ন হয়ে ভুল চিকিত্সা নিতে থাকেন অথবা সাধারণ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করে প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েই বসে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে উক্ত রোগীদের চিকিত্সা করা আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল। অনেক পরিবারই এই ব্যয় বহন করতে সক্ষম হন না কিংবা অবহেলা করেন,যার ফলশ্রুতিতে উক্ত রোগীদের একটি অংশ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন। সুতরাং,যথাসময়ে যথাস্থানে চিকিত্সা গ্রহণ করার ব্যাপারে সচেতন হওয়াও অনেক জরুরী।  

 

আমরা দেখেছি যে, দীর্ঘ মেয়াদী লিভার প্রদাহ ও সিরোসিসের জন্য দায়ী মূল ভাইরাস দুটি হলো হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস। বাংলাদেশে নবাগত শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষ সবাই বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো: হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস সমপর্কে সচেতনতার অভাব,সার্জারী, গাইনী ও ডেন্টিস্ট্রীর কাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতীগুলো ঠিকভাবে জীবানুমুক্ত না করা,উত্স যাচাই না করে রক্ত গ্রহণ,ইনজেকশন ঠিকমত ডিসপোস না করা এবং নাপিত কতৃক একই ব্লেড পুন:পুন: ব্যবহার। এছাড়া,এমন অনেক পরিবার পাওয়া যাচ্ছে যাদের একাধিক সদস্য হেপাটাইটিস ‘বি’-তে আক্রান্ত। মূলত অনিরাপদ যৌনমিলনের কারণে এবং স্বামী-স্ত্রীর একজন হেপাইটাইটিস ‘বি’-তে আক্রান্ত থাকলে অন্য একজন হেপাটাইটিস ‘বি’-এর টিকা না নেয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রী পরস্পর হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া, জন্মের সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ সমপর্কে অজ্ঞতার কারণে আক্রান্ত মা থেকে শিশুতে হেপাটাইটিস বি ছড়িয়ে পড়ছে।

 

হেপাটাইটিস বি এবং সি আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু যে ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা নয়। বরং,এর প্রভাব পড়ে উক্ত ব্যক্তির পরিবারে,সমাজে,এমনকি পুরো রাষ্ট্রে। যে ব্যক্তি রক্তে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ বহন করছেন তিনি পরিবারের অন্য একজন সদস্যের আক্রান্ত হওয়ার কারণ হতে পারেন। রক্তে হেপাটাইটিস ‘বি’ বহনকারী ব্যক্তি যোগ্যতা থাকা সত্যেও বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে মেডিকেলি আনফিট বিবেচিত হন। পরিবারের একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির লিভার সিরোসিস হলে তিনি অসুস্থতার কারণে কোন পেশায় নিয়োজিত হতে পারেন না। বরং,সিরোসিস চিকিত্সার জন্য নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে, পরিবারের অর্থনীতির জন্য তিনি একটি বোঝা হয়ে দাড়ান। একটি সমাজে এরুপ বেশ কিছু লোক যদি অকর্মক্ষম হয়ে পড়ে থাকেন,তা সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি বাঁধা হিসেবে কাজ করে। সমাজে তারা হেপাটাইটিসের উত্স হিসেবে কাজ করেন। এ ব্যক্তিদের পেছনে রাষ্ট্রের চিকিত্সা ব্যয়ও বেড়ে যায়। অথচ, একটু সচেতন হলে এবং সময়মত টিকা গ্রহণ করলে উপরোক্ত অনেক ব্যক্তিই দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহ প্রতিরোধ করতে পারতেন। অনুরুপ, মানুষের মাঝে উক্ত রোগ সমপর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকলে যথাযথ সময়ে রোগ নির্ণয় করা, চিকিত্সা শুরু করা এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়াও সম্ভব।

 

হেপটাইটিস রোগের  treatments for hepatitis চিকিত্সা বাংলাদেশেই হয়। এর জন্য অযথা বিদেশে ছোটাছুটি করা অবান্তর। আমরা দেখেছি যে, হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং হেপটাইটিস ‘ই’ দ্ব্বারা সৃষ্ট হেপাটাইটিস রোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সেড়ে যায়। যথাযথ বিশ্রাম নিলে এবং ডাক্তারের পরামর্শ মত কিছু ওষুধ সেবন করলে ও নিয়মমত খাবার গ্রহণ করলে এই রোগ আপনাআপনিই ভাল হয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি  করে চিকিত্সা করা লাগতে পারে। যেমন: রোগীর যদি এমন ক্ষুধামন্দা,বমি বমি ভাব ও বমির প্রবণতা থাকে যে রোগী মুখে কোন খাবার গ্রহণ করতে পারছে না। এছাড়া, গর্ভবতী মহিলা ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ও মহামারী আকারে ভাইরাল হেপাটাইটিস দেখা দিলেও হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে।    

 

হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কয়েকটি পরিণতি হতে পারে। সে লক্ষণহীন অবস্থায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের সারফেস এন্টিজেন বহন করতে পারে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে নিয়মিত ফলোআপ-এ থাকতে হয়, যেন যে কোন সময় ভাইরাস বংশবৃদ্ধি শুরু করলে চিকিত্সা করা যায়। যে সকল রোগী লক্ষণহীন অবস্থায় থাকে, কিন্তু ভাইরাস লিভারে একটিভ থাকে তথা বংশবৃদ্ধি করতে থাকে তাদের ক্ষেত্রে ইনজেকশন বা মুখে নেয়ার ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা যায়, যা বাংলাদেশে সহজপ্রাপ্য। এছাড়া বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞগণ ‘বি’ ভাইরাস থেকে সৃষ্ট সিরোসিস রোগের চিকিত্সাও সফলতার সাথে করে আসছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাস বহন করছেন তাদের চিকিত্সাও বাংলাদেশে হচ্ছে এবং নতুন চিকিত্সায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রোগীকে ভাল করা সম্ভব। এমনকি,‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত লিভার ক্যান্সারের hepatitis c treatment cost ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্ল্যানটেশন করার চেষ্টাও বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞরা শুরু করেছেন।

 

হেপাটাইটিস রোগ থেকে মুক্তির উপায় Cures for hepatitis 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে যে বিষয়টি দিবালোকের মত স্পষ্ট তা হলো হেপাটাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আমাদের ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেমিনার, সিমেপাজিয়াম, আলোচনা সভার আয়োজন করতে হবে। দেশের মিডিয়ার ভুমিকা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী। সাংবাদিক বন্ধুগ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক আর্টিকেল ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণমানুষের মাঝে হেপাটাইটিসের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ সমপর্কে তথ্য পৌছে দিবেন। ভবিষ্যতে হেপাটাইটিস রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার কল্পে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। বাংলাদেশে সরকার যেমন টিকাদান (hepatitis treatment)কর্মসূচীকে উল্লেখযোগ্য সফলতায় নিতে সক্ষম হয়েছে, তেমনি সরকারের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সহযোগীতায় হেপাটাইটিস রোগের ব্যপ্তিও কমিয়ে আনা সম্ভব।

 

পারিবারিক ও সামাজিকভাবে লজ্জায় পড়ার ভয়ে রক্তে হেপাটাইটিস বি বহনকারী অনেক ব্যক্তি তা প্রকাশ করেন না। ফলে, তারা যথাসময়ে চিকিত্সা গ্রহন করেন না। এছাড়া, বিভিন্ন ভুল ধারণার কারণে তারা তাদের কর্মস্থল থেকে ছিটকে পরেন। এ সকল ব্যক্তিদের মানসিক সাহস প্রদান করা এবং কর্মস্থলের প্রতিবন্ধকতা দূর করার মাধ্যমে  কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেয়া গেলে একদিকে তারা চিকিত্সা গ্রহনে আত্মবিশ্বাসী হবেন, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবেও তাদের পরিবার ও সমাজ উপকৃত হবে। যথাসময়ে চিকিত্সা গ্রহণ করার কারণে বি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবও কমে আসবে।

 

উপসংহার 

প্রতি বছর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের একটি স্লোগান থাকে। এবারের স্লোগানটি হলো- “হেপাটাইটিস প্রতিরোধ: নির্ভর করছে আপনার উপর।” অর্থাত্ হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতা এবং উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরী। সুতরাং, ব্যক্তি, সমাজিত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী রিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা হেপাটাইটিস রোগের প্রতিরোধকল্পে সম্মিলিত ভাবে এগিয়ে যাবো। একমাত্র এভাবেই জনসচেতনতা তৈরীর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে হেপাটাইটিস মুক্ত বিশ্ব। 

 

লেখক: অধ্যাপক মবিন খান পরিচালক

দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মির্জা গোলাম হাফিজ রোড 

বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ

ধানমন্ডি, ঢাকা

আরো অনেকে খুজেছে

    hbsag viras bangla, hepatitis b bangla, hepatitis b in bangla language, hepatitis bangla, jondice roger lokhhon bengali, symptom of hapatites b in bangla, what is hepatasis in banglai language
সাইটের প্রকাশিত কোনো পোস্ট অন্য কোথাও প্রকাশ করলে অবশ্যই আমার হেল্থ বাংলা ডট কম (Healthbangla.com) এর কথা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হবে। বিনা অনুমতিতে  হেল্থ বাংলা- এর কন্টেন্ট ব্যবহার আইনগত অপরাধ, যে কোন ধরনের কপি-পেস্ট কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, এবং কপিরাইট আইনে বিচার যোগ্য!

About the Author

Afsana Spell

আমি আফসানা। Health Bangla ডট কম এর একজন লেখক। পেশায় MBBS Doctor। বর্তমানে Internship শেষ করে Training এ আছি। আমাকে আপনার সমস্যার কথা লিখে পাঠান afsanaspell@gmail.com ইমেইল এ।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!